এক সুতোয় দুই দেশ: কোরিয়া ও ভারতের সংস্কৃতির সাতটি অদ্ভুত মিল

আমুদরিয়া নিউজ: বিশ্বের মানচিত্রে দক্ষিণ কোরিয়া এবং ভারত—দুটি ভিন্ন ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক মেরুতে অবস্থিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতীয় তরুণ প্রজন্মের মধ্যে কোরিয়ান নাটক (K-Drama) এবং কোরিয়ান পপ সংগীতের (K-Pop) জনপ্রিয়তা আকাশ ছুঁয়েছে। ঠিক একইভাবে কোরিয়াতেও ভারতীয় সংস্কৃতি, বিশেষ করে বলিউড সিনেমা ও মসলাদার খাবারের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। আপাতদৃষ্টিতে দুই দেশের ভাষা, পোশাক ও খাদ্যাভ্যাস আলাদা মনে হলেও, তাদের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক গভীরে তাকালে এমন কিছু অভূতপূর্ব মিল খুঁজে পাওয়া যায়, যা সত্যিই অবাক করার মতো।

১. বড়দের সম্মান ও পারিবারিক মূল্যবোধ
উভয় সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় ভিত্তি হলো যৌথ পারিবারিক মূল্যবোধ এবং গুরুজনদের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা। ভারতে যেমন বড়দের পা ছুঁয়ে প্রণাম করার বা মাথা নত করে সম্মান জানানোর রীতি রয়েছে, দক্ষিণ কোরিয়াতেও ঠিক একইভাবে মাথা নিচু করে সম্মান প্রদর্শন করা অত্যন্ত বাধ্যতামূলক একটি সামাজিক শিষ্টাচার। দুই দেশেই পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত বলে গণ্য করা হয় এবং বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানদের আজীবন দায়িত্বশীল থাকার মানসিকতা শেখানো হয়।

২. ভাষা ও শব্দভাণ্ডারের মিল
ভাষাতাত্ত্বিক দিক থেকে তামিল ভাষার সাথে কোরিয়ান ভাষার এক অদ্ভুত ঐতিহাসিক মিল রয়েছে। তবে এর বাইরেও পারিবারিক সম্পর্কের সম্বোধনে দুই দেশের শব্দভাণ্ডার প্রায় একই রকম। যেমন— বাংলায় আমরা যাকে ‘মা’ বা ‘বাবা’ বলি, কোরিয়ান ভাষাতেও তা যথাক্রমে ‘উম্মা’ এবং ‘আপ্পা’। এছাড়া বড় বোনকে বাংলায় যেমন ‘দিদি’ বলা হয়, কোরিয়ান ভাষায় পুরুষরা তাঁদের বড় বোন বা দিদিকে ‘নুনা’ এবং নারীরা ‘উন্নি’ বলে ডাকেন।

৩. জুতো ঘরের বাইরে রাখার ঐতিহ্য
ভারতীয় বাড়িগুলোতে ঘরের ভেতরে বাইরের জুতো নিয়ে প্রবেশ করাকে অত্যন্ত অশুভ ও অস্বাস্থ্যকর মনে করা হয়। এই একই নিয়ম কঠোরভাবে মেনে চলা হয় দক্ষিণ কোরিয়াতেও। কোরিয়ানদের ঘরের প্রবেশদ্বার এ জুতো খুলে রাখার নির্দিষ্ট জায়গা থাকে। তারা মেঝেতে বসে খাওয়া এবং ঘুমানো পছন্দ করে, যা সনাতন ভারতীয় জীবনযাত্রার হুবহু প্রতিচ্ছবি।

৪. খাবার টেবিলে চাল ও ঝালের আধিপত্য
খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রেও দুই দেশের মানুষের পছন্দ প্রায় এক। কোরিয়ান ও ভারতীয়—উভয় সংস্কৃতির প্রধান খাদ্য হলো চাল বা ভাত। ভারতের প্রতিটি সাধারণ খাবারের থালিতে যেমন ভাত অপরিহার্য, কোরিয়াতেও ‘বাপ’ (Bap – সিদ্ধ ভাত) ছাড়া খাবার কল্পনা করা যায় না। এর পাশাপাশি দুই দেশের মানুষই খাবারে প্রচুর পরিমাণে লঙ্কা বা ঝাল এবং রসুন ব্যবহার করতে ভালোবাসে। কোরিয়ানদের ঐতিহ্যবাহী ‘কিমচি’ বা আচার তৈরির প্রক্রিয়ার সাথে ভারতীয় আচার বানানোর রীতির দারুণ মিল রয়েছে।

৫. উৎসব ও ফসল কাটার আনন্দ
কোরিয়ার সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ উৎসব হলো ‘চুসোক’, যাকে কোরিয়ান থ্যাংকসগিভিং ডে-ও বলা হয়। এটি মূলত শরৎকালীন ফসল কাটার উৎসব, যেখানে পরিবারের সবাই একসঙ্গে মিলিত হয়ে পূর্বপুরুষদের স্মরণ করে এবং বিশেষ পিঠে তৈরি করে। ভারতের ‘নবান্ন’, ‘পোঙ্গল’ বা ‘মকর সংক্রান্তি’ উৎসবের মূল ভাবনার সাথে এই ‘চুসোক’-এর কোনো তফাত নেই।

৬.ঐতিহাসিক রাজকীয় বন্ধন
কোরিয়ার একটি প্রাচীন কিংবদন্তি অনুযায়ী, এই দুই দেশের সাংস্কৃতিক মিল কেবল কাকতালীয় নয়, এর পেছনে রয়েছে হাজার বছরের পুরনো এক ইতিহাস। কোরিয়ান ঐতিহাসিক গ্রন্থ ‘সামগুক ইউসা’ অনুযায়ী, খ্রিষ্টীয় প্রথম শতকে অযোধ্যার এক রাজকুমারী সমুদ্রযাত্রা করে কোরিয়ায় পৌঁছান এবং গায়া রাজ্যের রাজা ‘কিম সুরো’-কে বিয়ে করেন। এই কারণে আজও কোটি কোটি কোরিয়ান নাগরিক ভারতকে তাঁদের মাতুলালয় বা দাদুবাড়ি বলে মনে করেন।

৭. স্বাধীনতা দিবসের এক অদ্ভুত সংযোগ
রাজনৈতিক ইতিহাসে দুই দেশের লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও, তাদের বিজয়ের দিনটি কিন্তু এক। ১৯৪৫ সালের ১৫ই আগস্ট দক্ষিণ কোরিয়া জাপানি ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি লাভ করে। ঠিক তার দুই বছর পর, ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট ভারত ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা পায়। ফলে প্রতি বছর ১৫ই আগস্ট দুই দেশই অত্যন্ত মর্যাদার সাথে তাদের জাতীয় মুক্তি দিবস উদযাপন করে।

বর্তমান গ্লোবালাইজেশনের যুগে কোরিয়ান সংস্কৃতির জোয়ার ভারতকে যেভাবে আপ্লুত করছে, তা আসলে কোনো নতুন বিষয় নয়। বরং এটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা দুটি প্রাচীন এশীয় সভ্যতার আত্মিক পুনর্মিলন মাত্র।

Total Views: 0
Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *