আমুদরিয়া নিউজ: বিশ্বের বৃহত্তম ক্রান্তীয় বনাঞ্চল আমাজন রেইনফরেস্টকে আমরা ‘পৃথিবীর ফুসফুস’ বলে জানি। এর বুক চিরে বয়ে চলা আমাজন নদী আর বিশাল সবুজ প্রকৃতি দূর থেকে দেখতে অপরূপ সুন্দর হলেও, এর গভীরে লুকিয়ে রয়েছে এক আদিম ও চরম নিষ্ঠুর পরিবেশ। আমাজনের গহীন অরণ্যে পা রাখা মানেই প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর মুখে পড়া। কেন এই বনকে প্রকৃতির সবচেয়ে ভয়ংকর নরককুণ্ড বলা হয়, দেখে নেওয়া যাক তার কয়েকটি কারণ:
বিষাক্ত প্রাণী ও শিকারীদের স্বর্গরাজ্য
আমাজন হলো পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক সব প্রাণীদের আখড়া। এখানে বাস করে বিশ্বের বৃহত্তম সাপ ‘গ্রিন অ্যানাকোন্ডা’ এবং নদীমাতৃক ত্রাস ‘ব্ল্যাক কেইম্যান’ (বিশাল আকৃতির কুমির)। স্থলভাগে রয়েছে হিংস্র শিকারী জাগুয়ার। এছাড়া এখানকার নদীগুলোতে সাঁতার কাটে মাংসখেকো পিরানহা মাছ এবং ‘ইলেকট্রিক ইঁল’, যা এক ঝটকায় ৮৬০ ভোল্ট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে নিমেষে অবশ করে দিতে পারে।
বুলেট অ্যান্ট এবং বিষাক্ত ডার্ট ফ্রগ
এখানে বড় প্রাণীদের চেয়েও বেশি আতঙ্ক ছড়ায় ছোট ছোট আণুবীক্ষণিক ও বিষাক্ত জীবকুল। আমাজনে পাওয়া যায় ‘বুলেট অ্যান্ট’ (Bullet Ant), যার কামড়ের যন্ত্রণা বন্দুকের গুলির আঘাতের সমান তীব্র এবং ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এছাড়া রয়েছে মাত্র দুই ইঞ্চি আকৃতির ‘পয়জন ডার্ট ফ্রগ’ (Poison Dart Frog)। এই উজ্জ্বল রঙের ব্যাঙগুলোর ত্বক এতটাই মারাত্মক বিষে ভরা যে, মাত্র একটি ব্যাঙের বিষে ১০ জন মানুষের মৃত্যু হতে পারে।
চির অন্ধকার ও গোলকধাঁধা
আমাজনের বনাঞ্চল এতটাই ঘন যে এর ওপরের অংশ গাছের পাতা ও ডালে সম্পূর্ণ ঢাকা থাকে, যাকে ‘ক্যানোপি’ বলা হয়। এর ফলে বনের প্রায় ৯৯ শতাংশ মাটিতে সূর্যের আলো পৌঁছায় না। ভরদুপুরেও বনের নিচে ঘুটঘুটে অন্ধকার আর স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ বজায় থাকে। এই চির অন্ধকারে কোনো কম্পাস বা আধুনিক জিপিএস ছাড়া পথ চেনা অসম্ভব। একবার রাস্তা হারালে এই অন্তহীন সবুজ গোলকধাঁধা থেকে জীবিত ফিরে আসা প্রায় অলৌকিক ঘটনা।
ফুটন্ত নদী ও সংক্রামক ব্যাধি
আমাজনের গভীরে রয়েছে ‘শ্যানায়-টিম্পিশকা’ নামের একটি রহস্যময় নদী, যার জল প্রাকৃতিকভাবেই ফুটন্ত (তাপমাত্রা প্রায় ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস)। এই জলে কোনো জীব পড়ে গেলে তার সেদ্ধ হয়ে মৃত্যু নিশ্চিত। এছাড়া আমাজনের ভ্যাপসা গরম ও অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে বাতাস সবসময় ভারী থাকে। এই পরিবেশ ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, ইয়েলো ফিভার এবং আমাজনিয়ান ব্লাস্টোমাইকোসিসের মতো মারাত্মক ছত্রাকজনিত রোগের প্রধান প্রজনন ক্ষেত্র।
বাইরের দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন আদিবাসী
আমাজনের অতি দুর্গম এলাকায় এমন কিছু আদিবাসী উপজাতি বাস করে, যারা আধুনিক সভ্যতার ছোঁয়া পায়নি এবং বাইরের পৃথিবীর মানুষকে চরম শত্রু মনে করে। নিজেদের সীমানায় কোনো বহিরাগতকে দেখলেই তারা বিষাক্ত তীর ও বর্শা নিয়ে আক্রমণ করে। তাদের এই অতর্কিত আক্রমণ থেকে বেঁচে ফেরা সাধারণ মানুষের পক্ষে অসম্ভব।
প্রকৃতির এই রূপই প্রমাণ করে যে, আমাজন কেবল একটি বন নয়, এটি এক জীবন্ত এবং অত্যন্ত বিপজ্জনক এক সাম্রাজ্য।
আমাজনের নরককুণ্ড: পৃথিবীর ফুসফুসে লুকিয়ে থাকা ৫টি চরম আতঙ্ক
Total Views:
0
Leave a Comment