কর্মক্ষেত্রের দুই মেরু: ভারতের ‘কর্পোরেট কালচার’ বনাম পশ্চিমাদের ‘ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালেন্স’

আমুদরিয়া নিউজ: বিশ্বায়নের এই যুগে ভারতীয় পেশাদারদের কাজের পরিধি কেবল দেশের মাটিতে সীমাবদ্ধ নেই। প্রতিদিন হাজার হাজার ভারতীয় তরুণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য বা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমাচ্ছেন উন্নত ক্যারিয়ারের আশায়। তবে ভারতের কর্পোরেট জগতের কর্ম পরিবেশের সাথে পশ্চিমা দেশগুলোর কর্মসংস্কৃতির একটি আকাশ-পাতাল তফাত রয়েছে। কাজের সময়সীমা থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত জীবনের স্বাধীনতা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই দুই গোলার্ধের নিয়ম সম্পূর্ণ আলাদা।
কাজের সময় ও ওভারটাইম
ভারতে অধিকাংশ কর্পোরেট বা বেসরকারি সংস্থায় ‘৯টা থেকে ৫টা’র কাজের কথা বলা হলেও, বাস্তবে তা অনেক সময়ই রাত ৮টা বা ৯টা পর্যন্ত গড়ায়। উইকএন্ড বা ছুটির দিনেও বসের ফোন বা ইমেইলের উত্তর দেওয়াটা এখানে অলিখিত নিয়ম। অন্যদিকে, পশ্চিমা দেশগুলোতে কাজের সময় অত্যন্ত কঠোরভাবে মেনে চলা হয়। বিকেল ৫টা বাজার সাথে সাথে কর্মীরা অফিস থেকে বেরিয়ে যান। ছুটির দিনে অফিসের কোনো কাজ করা বা সহকর্মীদের বিরক্ত করাকে সেখানে চরম অবিনয় এবং পেশাদারিত্বের অভাব হিসেবে দেখা হয়।
ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালেন্স ও মানসিক স্বাস্থ্য
পশ্চিমা কর্মসংস্কৃতির মূল ভিত্তি হলো ‘ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালেন্স’ বা কর্ম ও ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য। সেখানে মানসিক স্বাস্থ্যকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়। বার্ষিক ছুটির পাশাপাশি সেখানে কর্মীদের ‘বার্নআউট’ (অতিরিক্ত কাজের ক্লান্তি) থেকে বাঁচাতে বিশেষ ছুটি বা কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা থাকে। এর বিপরীতে, ভারতের কর্মক্ষেত্রে দীর্ঘক্ষণ টেবিলে বসে থাকাকেই বেশি পরিশ্রমী বা যোগ্যতার মাপকাঠি মনে করা হয়, যা কর্মীদের মানসিক চাপের অন্যতম প্রধান কারণ।
করপোরেট হায়ারার্কি বা পদমর্যাদার কড়াকড়ি
ভারতীয় অফিসগুলোতে সাধারণত একটি কঠোর ‘টপ-ডাউন’ বা ওপর থেকে নিচে নিয়মতান্ত্রিক কাঠামো বজায় থাকে। কর্মীদের সবসময় বসের নির্দেশ মেনে চলতে হয় এবং সিনিয়রদের ‘স্যার’ বা ‘ম্যাম’ বলে সম্বোধন করার সংস্কৃতি প্রচলিত। কিন্তু পশ্চিমা দেশগুলোতে কর্মসংস্কৃতি অনেক বেশি সমতাভিত্তিক। সেখানে সিইও থেকে শুরু করে ইন্টার্ন—সবাই একে অপরকে নাম ধরে ডাকেন এবং জুনিয়র কর্মীরাও যেকোনো মিটিংয়ে স্বাধীনভাবে নিজেদের মতামত বা বসের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতে পারেন।
ছুটির অধিকার এবং লিভ পলিসি
ইউরোপীয় দেশগুলোতে কর্মীদের বছরে চার থেকে পাঁচ সপ্তাহের পেইড ক্যাজুয়াল লিভ নেওয়া বাধ্যতামূলক। ছুটি কাটানোর সময় তারা সম্পূর্ণ ‘অফলাইন’ থাকেন। কিন্তু ভারতে ছুটি পাওয়া বা মঞ্জুর করানো বেশ কঠিন একটি প্রক্রিয়া। অনেক সময় ছুটি নিলেও ল্যাপটপ সাথে রাখতে হয় অথবা বাড়ি থেকে কাজ করতে বাধ্য হতে হয়।
চাকরির নিরাপত্তা এবং সুযোগ-সুবিধা
আমেরিকার মতো পশ্চিমা দেশে ‘অ্যাট-উইল এমপ্লয়মেন্ট’ নীতির কারণে যেমন হুট করে ছাঁটাইয়ের ঝুঁকি থাকে, তেমনই আবার শক্তিশালী শ্রম আইনের কারণে কর্মীরা ভালো সুযোগ-সুবিধাও পান। ভারতে সাধারণত বড় সংস্থাগুলোতে ছাঁটাইয়ের আগে নোটিশ পিরিয়ড দেওয়া হলেও, গড় বেতনের তুলনায় সুযোগ-সুবিধা বা জীবনযাত্রার মান পশ্চিমাদের চেয়ে অনেকখানি পিছিয়ে।

পরিশেষে বলা যায়, ভারত যেখানে বর্তমান যুগে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য কঠোর ও দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করার সংস্কৃতিকে আপন করে নিয়েছে, পশ্চিমা দেশগুলো সেখানে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে কর্মীদের ব্যক্তিগত সন্তুষ্টি এবং বিশ্রামের ওপর জোর দিচ্ছে।

Total Views: 0
Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *