আমুদরিয়া নিউজ: সময় বদলেছে, বদলেছে বিনোদনের মাধ্যমও। একসময় শুক্রবার মানেই ছিল সিনেমা হলের বাইরে লম্বা লাইন, ব্ল্যাকে টিকিট কাটার উত্তেজনা আর প্রিয় নায়কের এন্ট্রিতে হলের ভেতর সিটির আওয়াজ। কিন্তু আজ সেই চেনা ছবিটা অনেকটাই ফিকে। পকেটে থাকা স্মার্টফোন আর সস্তার ওটিটি (OTT) সাবস্ক্রিপশনের যুগে এখন প্রশ্ন উঠছে—সিনেমার হলের ম্যাজিক কি তবে সত্যিই শেষের মুখে?
ওটিটি বনাম সিঙ্গল স্ক্রিন: ঘরের কোনায় যখন মাল্টিপ্লেক্স
নেটফ্লিক্স, প্রাইম ভিডিও, জি-ফাইভ কিংবা হইচই—মোবাইল স্ক্রিনেই এখন বন্দি গোটা দুনিয়ার বিনোদন। মাত্র কয়েকশো টাকার রিচার্জে ঘরে বসেই এয়ারকন্ডিশনড রুমে শুয়ে দেখা যাচ্ছে বিশ্বের তাবড় তাবড় সিনেমা ও ওয়েব সিরিজ। তার ওপর করোনা মহামারীর পর থেকে বহু বড় বাজেটের ছবি থিয়েটার এড়িয়ে সরাসরি মুক্তি পাচ্ছে ওটিটি প্ল্যাটফর্মে। এর ফলে সাধারণ মানুষের হল-মুখী হওয়ার প্রবণতা অনেকটাই কমেছে। মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে এখন সপরিবারে মাল্টিপ্লেক্সে গিয়ে পপকর্ন আর টিকিটের পেছনে হাজার হাজার টাকা খরচ করার চেয়ে ওটিটি-র সাবস্ক্রিপশন অনেক বেশি সাশ্রয়ী।
ধুঁকছে টলিউড ও বাংলার ঐতিহ্যবাহী সিঙ্গল স্ক্রিন
এই ডিজিটাল ঝড়ের সবচেয়ে বড় কোপ পড়েছে পশ্চিমবঙ্গের সিঙ্গল স্ক্রিন সিনেমা হলগুলোর ওপর। কলকাতা থেকে শুরু করে উত্তরবঙ্গ—অসংখ্য ঐতিহ্যবাহী সিনেমা হল হয়তো ইতিমধ্যেই বন্ধ হয়ে গেছে, না হলে শপিং মল বা বহুতলে রূপান্তরিত হয়েছে। হল মালিকদের দাবি, শুধু ওটিটি নয়, ভালো মৌলিক বাংলা ছবির অভাব এবং টিকিটের ওপর চড়া ট্যাক্সের কারণে মাসের পর মাস লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের। স্টাফদের বেতন এবং চড়া বিদ্যুৎ বিল মেটাতে গিয়ে দেউলিয়া হওয়ার দশা অনেক হল কর্তৃপক্ষের।
মাল্টিপ্লেক্স কি পারবে হলের ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে?
সিঙ্গল স্ক্রিনের অবস্থা শোচনীয় হলেও, মাল্টিপ্লেক্সগুলো কিন্তু এখনও আধুনিক প্রযুক্তি, থ্রি-ডি স্ক্রিন এবং ডলবি অ্যাটমোস সাউন্ড সিস্টেমের জোরে দর্শকদের টানার চেষ্টা করছে। চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞদের মতে, লার্জার-দ্যান-লাইফ বা বিশাল ক্যানভাসের ছবি যেমন—’বাহুবলী’, ‘পুষ্পা’ বা কোনো বড় অ্যাকশন থ্রিলার ছবি ওটিটি-র ছোট স্ক্রিনে সেই রোমাঞ্চ দিতে পারে না। তাই ভালো কন্টেন্ট এবং সিনেমা হলের থিয়েট্রিক্যাল এক্সপেরিয়েন্সের টানে দর্শকরা এখনও হলে আসেন। তবে সেই সংখ্যাটা আগের চেয়ে অনেক সীমিত।
শেষ কথা: হারিয়ে যাবে নাকি রূপ বদলাবে?
সিনেমার হল হয়তো পুরোপুরি বিলুপ্ত হবে না, তবে তার রূপ বদলে যাচ্ছে। সিঙ্গল স্ক্রিনের জমানা পেরিয়ে ভবিষ্যৎ এখন মাল্টিপ্লেক্স এবং প্রিমিয়াম থিয়েটারের দিকে ঝুঁকছে। ওটিটি এবং সিনেমা হল—দুই মাধ্যমকেই পাশাপাশি টিকে থাকতে হলে সিনেমার গল্পে আনতে হবে নতুনত্ব। নয়তো আর কয়েক বছর পর সিনেমার হলের সেই সোনালী দিনগুলো শুধু ইতিহাসের পাতায় বা বাঙালির নস্টালজিয়াতেই বন্দি থেকে যাবে।