আমুদরিয়া নিউজ : নিট পরীক্ষা বাতিল হয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে বলে পরীক্ষা বাতিল। দু-তিন বছর ধরে প্রিপারেশন নিয়ে যে ২২ লক্ষের বেশি ছাত্রছাত্রী পরীক্ষায় বসেছিলেন, তাঁদের মাথায় হাত পড়েছে।
কোথায়, কীভাবে প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে বলে সন্দেহ হল সেটা জানেন কি! সরাসরি প্রশ্নপত্র বলে কিন্তু, এগুলো বিক্রি হয়নি।
লাস্ট মিনিট সাজেশন বা সম্ভাব্য প্রশ্নমালা বলে এটি বাজারে বিক্রি হয়।
এই প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ বলুন বা সন্দেহ বলুন, সেটার শুরু হয় কিন্তু রাজস্থানের সিকর জেলা সদরের একটি গার্লস পিজি থেকে। যে পিজিতে ডাক্তারি, ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পড়ুয়ারা থাকেন। সেই পিজির মালিক যিনি, তাঁর ছেলে কেরালায় ডাক্তারি পড়ে। এবার যে দিন নিট পরীক্ষা হয়, তার দুদিন আগে কেরালায় ডাক্তারির ছাত্রটির হাতে নিটের ওই সাজেশন বা সম্ভাব্য প্রশ্নপত্র পৌঁছায়। সে পরদিন তাঁর বাবাকে প্রশ্নপত্র পাঠিয়ে বলে দেয়, সেগুলো যেন পিডির ডাক্তারির পড়ুয়াদের দেওয়া হয়। এর থেকে প্রশ্ন আসতে পারে। তাঁর বাবা জানতে চাইলে সে বলে, ওই প্রশ্নপত্র সিকার থেকে তাঁকে একজন পাঠিয়েছে।
সিকারের পিজির মালিক পিজির নিট পরীক্ষার্থীদের দিয়ে দেন।
৩ মে নিট পরীক্ষা হয়। পিজি অপারেটর একটি কোচিং ইনস্টিটিউটের এক শিক্ষকের কাছে গিয়ে সাজেশন আকারের প্রশ্নপত্র দেখিয়ে জানতে চান, কতগুলো কমন পড়েছিল। তিনি জানতে পারেন, নিট পরীক্ষায় জীববিজ্ঞানের ৯০টি প্রশ্ন এবং রসায়নের ৪৫টি প্রশ্ন কমন পড়েছে। সম্ভাব্য সাজেশনে ছিল ২৮১টি প্রশ্ন।
NEET পরীক্ষায় একেকটি প্রশ্নের নম্বর হল ৪। মোট ১৮০টি প্রশ্ন থাকে। তখন যাচাই কারীরা বুঝতে পারেন, সম্ভাব্য প্রশ্নপত্রে ৪৫টি কেমিস্ট্রির প্রশ্ন একেবারে NEET পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের মতোইপরপর সাজানো, দাঁড়ি, কমা, হাইফেনও একই।
তখন পিজি অপারেটরের সন্দেহ হয়। তিনি সিকারের উদ্যোগনগর থানায় গিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। তাঁর দাবি, পুলিশ তাকে গুজব ছড়াতে নিষেধ করে থানা থেকে চলে যেতে নির্দেশ দেয়। এর পরে তিনি NEET পরীক্ষা যাঁরা নেয়, সেই ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (NTA)-কে সব জানিয়ে দেন।
NTA ০এর পক্ষে দেশের গোয়েন্দা বিভাগ বা ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো (IB)-কে জানানো হয়। সেখান থেকে রাজস্থান পুলিশকে অ্যালার্ট করা হয়। রাজস্থানে পুলিশের স্পেশাল অপারেশন গ্রুপ তদন্ত শুরু করে এবং পিজির মালিক সহ ১৫ জনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করে।
এখানে জানিয়ে রাখি, রাজস্থানের কোটার পরেই এখন এডুকেশন হাব হল সিকার।
ছবির মতো হাভেলি রয়েছে এখানে। বিখ্যাত খাটুশ্যাম মন্দিরও সেখানে।
এটি জয়পুর থেকে প্রায় ১১৬ কিমি, দিল্লি থেকে ২৮০ কিমি এবং বিকানির থেকে ২২০ কিমি দূরে অবস্থিত।
তা হলে হুবহু প্রশ্ন মিলল কীভাবে!
এটা তো ঘটনা য়ে কোশ্চেন হাতে পেতে হবে। না হলে একদম মিলবে কিভাবে!
প্রাথমিকভাবে সন্দেহ করা হচ্ছে, প্রশ্নপত্রটি মহারাষ্ট্রের নাসিকের যে প্রেসে ছাপা হয়েছে সেখান থেকে ফাঁস হয়ে থাকতে পারে। ছাপাখানার সঙ্গে যুক্ত কেউ সম্ভবত প্রশ্নপত্রটি জালিয়াতদের নেটওয়ার্ক চেন-এ পৌঁছে দিয়েছে প্রশ্নমালা।
তদন্তের গতি অনুসারে, এটি প্রথমে হরিয়ানার গুরুগ্রামের এক ডাক্তারের কাছে পৌঁছায়। এরপর জয়পুরের জামওয়া রামগড়ের একজন ওই ডাক্তারের কাছ থেকে প্রশ্নমালা কেনে। সিবিআই আসরে নেমে নাসিকের ছাপাখানার সঙ্গে যুক্ত সন্দেহভাজনকে আটক করেছে।
তদন্ত এগোতেই দেখা গিয়েছে, জামওয়া রামগড়ের সেই ব্যক্তি যিনি ডাক্তারের থেকে প্রশ্নমালা কেনেন, তিনি সিকারের রাকেশ কুমার মান্ডাওয়ারিয়া নামের এক ব্যক্তির কাছে তা পৌঁছে দেন।
এই রাকেশ হল সিকারের বড় বড় ডাক্তারির কোচিং ইনস্টিটিউটগুলোর কাউন্সেলর মানে এমবিবিএস কাউন্সেলিং এজেন্ট হিসেবে কাজ করে।
সন্দেহ করা হচ্ছে, এর পরেই প্রশ্নমালাগুলো সম্ভাব্য প্রশ্নপত্র শিরোনাম দিয়ে আরও কিছু প্রশ্ন মিশিয়ে বাজারে বিক্রি করা হয়। তবে খুল্লমখুল্লা নয়। ওয়ান টু ওয়ান নেটওয়ার্ক বেসিসে বিক্রি হয়। দিল্লি, জম্মু ও কাশ্মীর, বিহার, কেরলম ও উত্তরাখণ্ডের কিছু কোচিং সেন্টারে পৌঁছায়।
তদন্তে জানা গিয়েছে, ৩ মে পরীক্ষার প্রায় ১৫ দিন আগে থেকেই সম্ভাব্য প্রশ্নপত্র হিসেবে আসল প্রশ্নপত্র বাজারে ঘুরছিল। ওয়ান টু ওয়ান বেসিসে নেটওয়ার্কটি মেডিকেল পরীক্ষার্থীদের কাছে ৩০,০০০ থেকে ২৮ লক্ষ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছিল।
তদন্তে জানা গিয়েছে, নাগৌরের এক ছাত্র, যিনি ৩ মে পরীক্ষার চার দিন ৩০ এপ্রিল সিকারে পৌঁছান, তিনি সম্ভাব্য প্রশ্নপত্রটির জন্য ২৮ লক্ষ টাকা খরচ করেন। ওই ছাত্রকেও জেরা করা হয়েছে। সে জানিয়েছে, প্রশ্নপত্র এসে গেছে খবর পেয়ে তিনি সিকারে পৌঁছান।
তদন্তে নেমে দেরাদুন এবং ঝুনঝুনুতে অভিযান হয়। সন্দেহভাজনদের আটক করা হয়। সিকারের এমবিবিএস কাউন্সেলর রাকেশকে ধরা হয়। সব মিলিয়ে ১৫ জনকে এখনও ধরা হয়েছে।
জয়পুর থেকে মণীশ নামে এক ব্যক্তিকে পুলিশ ধরেছে। তদন্তকারীদের সন্দেহ, এই মণীশই সম্ভবত প্রশ্ন ফাঁসের ‘মূলচক্রী’।
অবশ্য নিটের প্রশ্ন ফাঁস ২০২৪ সালেও হয়েছিল। ঝাড়খণ্ডের হাজারিবাগের এক প্রতিষ্ঠানের প্রিন্সিপাল সহ ৩ জনকে সিবিআই গ্রেফতার করেছিল। সেবার কন্ট্রোল রুম থেকে ডিজিটাল সিল খুলে প্রশ্ন চুরি করা হয়েছিল।
এবার কবে গোটা চক্রটি ধরা পড়ে সেটাই দেখার। তার পরে ফের কবে পরীক্ষা হবে সেটাও একটা বড় প্রশ্ন।
Leave a Comment