১. বেগম খালেদা জিয়া জন্মগ্রহণ করেন ব্রিটিশ ভারতের বঙ্গ প্রদেশের জলপাইগুড়িতে, যা দিনাজপুর জেলার অন্তর্ভুক্ত। পরবর্তীতে চলে আসেন দিনাজপুরের মুদিপাড়ায়। তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন একটি মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারে, যেখানে তার বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা এবং মা তায়েবা মজুমদার ছিলেন গৃহিণী।
২. ১৯৬০ সালে বেগম খালেদা জিয়া মেজর জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। জিয়াউর তখন ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন ক্যাপ্টেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর, খালেদা জিয়া এবং তার পরিবার অনেকটা গৃহবন্দি অবস্থায় কাটান। পরবর্তীতে, ১৯৭৭ সালে তার স্বামী জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হন।
৩. ১৯৮১ সালের ৩০শে মে চট্টগ্রামে একটি সামরিক অভ্যুত্থানে তার স্বামী রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পর বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা খালেদাকেই তার স্বামীর উত্তরাধিকার হিসেবে দেখেছিলেন যিনি দলের প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীগুলোকে একত্রিত করতে পারেন।
৪. ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বেগম খালেদা জিয়া বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ, মেজর জিয়াউর রহমানের অনুপস্থিতিতে, যখন সিওডি থেকে অস্ত্র সরানোর নির্দেশ দেওয়া হয়, বেগম খালেদা জিয়া নির্দ্বিধায় সিদ্ধান্ত নেন যে, মেজর জিয়ার অনুমতি ছাড়া কোনো অস্ত্র সিওডি থেকে বাইরে যাবে না। বেগম খালেদা জিয়ার সময়োচিত সিদ্ধান্তের কারণে ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ১,১০০ সৈন্য এবং মেজর জিয়া অস্ত্রহীন হওয়ার হাত থেকে বাঁচেন।
৫. ১৯৯১ সালে, বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হন। এটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। তিনি বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী, এবং মুসলিম মহিলাদের মধ্যে পাকিস্তানের বেনজির ভুট্টোর পর দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী।
৬. তাঁর বড় ছেলে তারেক রহমান ২০০৮ সালে একটি সামরিক সমর্থিত সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের সময় গ্রেপ্তার হওয়ার পর নির্বাসনে যান; তাঁর ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো ২০১৫ সালে বিদেশে থাকাকালীন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
৭. তাঁর প্রশাসন অর্থনৈতিক উদারনীতি, রপ্তানি বৃদ্ধি, শিল্পের পুনরুজ্জীবন, পোশাক উৎপাদন ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং শিক্ষার ব্যাপক প্রসারের নীতি গ্রহণ করেছিল – বিশেষ করে মেয়েদের জন্য। তাঁর শাসনামলেই একটি তুলনামূলকভাবে স্বাধীন সংবাদমাধ্যমেরও প্রসার ঘটে।
৮. ২০০৬ সালে যখন তাঁর সর্বশেষ নির্বাচিত মেয়াদ শেষ হয়, তখন বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার ছিল প্রায় ৭ শতাংশ – যা দেশের স্বাধীনতার পরবর্তী ইতিহাসের অন্যতম সর্বোচ্চ এবং ১৯৯০-এর দশকের গড় প্রায় ৪.৮ শতাংশ এবং ১৯৮০-এর দশকের প্রায় ৩.৮ শতাংশের তুলনায় অনেক বেশি। সেই সময়ে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে “এশিয়ার পরবর্তী টাইগার অর্থনীতি” হিসেবে বর্ণনা করেছিল।
৯. তাঁর পরিচালিত সরকার সমালোচনার মুখেও পরেছে। ১৯৯৫ সালে শীতকালীন ধানচাষের সময়ে সার-এর তীব্র ঘাটতি দেখা দেয়। মজুতদারি ও বিতরণ ব্যবস্থার ব্যর্থতার কারণে সারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, যার ফলে হাজার হাজার কৃষক প্রতিবাদে নেমে আসেন। একাধিক জেলায় পুলিশ গুলি চালালে সংঘর্ষে অন্তত এক ডজন কৃষক ও একজন পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হন। এই ঘটনাগুলো গ্রামীণ এলাকায় গভীর অসন্তোষ সৃষ্টি করে এবং তাঁর সরকারের ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। পরবর্তীতে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকায় তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় অন্তত ২৪ জন নিহত ও শতাধিক আহত হন। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়কার তদন্ত সমালোচিত হয়, কারণ বিশ্বাসযোগ্য সূত্র অনুসরণ না করে ইসলামপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীর ভূমিকা উপেক্ষা করা হয়, যদিও পরবর্তীতে তদন্তে তাদের দায় স্বীকার করা হয়।
১০. বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তীকালের কর্মকাণ্ডের জন্য ২০১১ সালের ২৪ মে নিউ জার্সি স্টেট সিনেট, খালেদা জিয়াকে ‘ফাইটার ফর ডেমোক্রেসি’ পদক প্রদান করে, যা কোনো বিদেশির জন্য প্রথম। পরে ২০১৮ সালের ৩১ জুলাই কানাডিয়ান হিউম্যান রাইটস ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন তাকে ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’ সম্মাননা দেয়।