স্বামী বিবেকানন্দের শিক্ষাজীবন বিস্ময়কর। তাঁর অসাধারণ মেধা ও স্মৃতিশক্তি থাকা সত্ত্বেও পরীক্ষার ফল খুব উজ্জ্বল ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষায় তিনি ৪৭% নম্বর পান, এফএ (ইন্টারমিডিয়েট) পরীক্ষায় পান ৪৬% এবং বিএ পরীক্ষায় তাঁর প্রাপ্ত নম্বর ছিল ৫৬%। যদিও এই সংখ্যাগুলো তাঁর জ্ঞান, বিশ্লেষণক্ষমতা বা বুদ্ধিবৃত্তির গভীরতাকে প্রতিফলিত করে না। তাঁর দর্শন, ইতিহাস, সাহিত্য, ধর্মতত্ত্ব এবং পাশ্চাত্য চিন্তাধারায় গভীর দখল ছিল। বিবেকানন্দ নিজেই বিশ্বাস করতেন যে শিক্ষা মানে কেবল নম্বর নয়, বরং চরিত্র গঠন, আত্মবিশ্বাস এবং মানুষের সেবার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা।

স্বামী বিবেকানন্দ কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রায় ৫০০ পৃষ্ঠার একটি বই পড়ে শেষ করতে পারতেন এবং পড়ার পর প্রায় সবকিছু মনে রাখতে পারতেন। একবার একটি গ্রন্থাগার থেকে বই নিয়ে তিনি পরের দিনই তা ফেরত দেন। এতে গ্রন্থাগারিক সন্দেহ প্রকাশ করেন যে তিনি বইটি আদৌ পড়েছেন কি না। তাই গ্রন্থাগারিক তাঁকে বইটির বিভিন্ন অংশ থেকে প্রশ্ন করেন। বিবেকানন্দ অনায়াসেই সব প্রশ্নের উত্তর দেন এবং এমনকি বইয়ের নির্দিষ্ট পৃষ্ঠা ও অনুচ্ছেদও উল্লেখ করতে পারেন। এই ঘটনা তাঁর অবিশ্বাস্য স্মৃতিশক্তি ও গভীর মনোযোগের ক্ষমতাকে প্রমাণ করে।

স্বামী বিবেকানন্দ চা ভালোবাসতেন এবং তাঁর মঠে চা পানের প্রচলন করেন এমন এক সময়ে, যখন অনেক গোঁড়া হিন্দু পণ্ডিত চা পানকে অশুচি বা ধর্মবিরোধী বলে মনে করতেন। তাঁর মতে, খাদ্য বা পানীয়ের মধ্যে পবিত্রতা বা অপবিত্রতা নেই; মানুষের মন ও উদ্দেশ্যই আসল। তিনি বিশ্বাস করতেন যে স্বাস্থ্য রক্ষা ও কর্মক্ষমতা বজায় রাখার জন্য যা প্রয়োজন, তা গ্রহণ করা দোষের নয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর উদারতা ও বাস্তববোধের পরিচয় দেয়। সমাজের অন্ধ সংস্কার ভেঙে যুক্তিবাদ ও মানবকল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর এই পদক্ষেপ গভীর তাৎপর্য বহন করে।

আমেরিকায় অবস্থানকালে স্বামী বিবেকানন্দ একবার তাঁর অসাধারণ মনঃসংযোগ ও স্বাভাবিক প্রতিভার পরিচয় দেন। তিনি আগে কখনও বন্দুক ব্যবহার করেননি। তবুও, একদিন অনুশীলনের সময় পরপর ১২ বার গুলি চালিয়ে জলের উপর ভাসমান ১২টি ডিমের খোসা নিখুঁতভাবে লক্ষ্যভেদ করেন। উপস্থিত সবাই এতে হতবাক হয়ে যায়। এই ঘটনা তাঁর একাগ্রতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং মানসিক স্থিরতার পরিচয় বহন করে। বিবেকানন্দ বিশ্বাস করতেন যে মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে মানুষ অসম্ভবকেও সম্ভব করতে পারে, এবং এই ঘটনাটি সেই দর্শনেরই বাস্তব উদাহরণ।

১৮৯৩ সালে আমেরিকা যাওয়ার পথে একটি জাহাজে স্বামী বিবেকানন্দের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় শিল্পপতি জামশেদজি টাটার। এই সাক্ষাতে বিবেকানন্দ ভারতকে বিজ্ঞান ও শিক্ষার ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরশীল করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তিনি টাটাকে একটি উচ্চমানের গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য অনুপ্রাণিত করেন, যেখানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চর্চা হবে আন্তর্জাতিক মানের। এই অনুপ্রেরণার ফলেই পরে বেঙ্গালুরুতে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স (আইআইএসসি) প্রতিষ্ঠিত হয়। ভারতের আধুনিক বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাসে এই প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অপরিসীম, এবং এর পেছনে বিবেকানন্দের চিন্তাভাবনার অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়।

স্বামী বিবেকানন্দ ভারতের জাতীয় চেতনাকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিলেন। সুভাষ চন্দ্র বসু তাঁকে “আধুনিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের আধ্যাত্মিক জনক” বলে অভিহিত করেন। মহাত্মা গান্ধীও স্বীকার করেছিলেন যে বিবেকানন্দের লেখা ও বক্তৃতা তাঁকে নিজের দেশ ও সংস্কৃতিকে নতুন চোখে দেখতে শিখিয়েছে। বিবেকানন্দ ভারতবাসীকে আত্মবিশ্বাসী হতে, নিজেদের শক্তির উপর বিশ্বাস রাখতে এবং দাসত্বের মানসিকতা ত্যাগ করতে উদ্বুদ্ধ করেন। তাঁর বাণী তরুণদের মধ্যে সাহস, আত্মসম্মান ও দেশপ্রেম জাগিয়ে তোলে।

স্বামী বিবেকানন্দের মানবিকতার উদাহরণ পাওয়া যায় তাঁর ট্রেনযাত্রার একটি ঘটনায়। একদিন ট্রেনে একজন দরিদ্র সেদ্ধ ছোলা বিক্রেতা তাঁর কামরায় উঠলে, বিবেকানন্দ তাঁর শিষ্যকে বলেন, “দেখো, ছোলা খেলে শক্তি বাড়ে।” উদ্দেশ্য ছিল বিক্রেতাকে উৎসাহ দেওয়া। শিষ্য প্রথমে সামান্য ছোলা কিনে চার আনা দেন। কিন্তু বিবেকানন্দ জানতে পেরে বলেন, এটি খুব কম, কারণ বিক্রেতার পরিবার আছে। তিনি শিষ্যকে পুরো এক টাকা দিতে বলেন, যা তখন অনেক বড় অঙ্ক। কিন্তু এত উদারভাবে টাকা দিলেও বিবেকানন্দ নিজে ছোলা খাননি। ঐ মানুষটির সাহায্যই ছিল তাঁর আসল লক্ষ্য।

আমেরিকায় একবার একজন বিদেশী স্বামী বিবেকানন্দকে জিজ্ঞাসা করেন, কেন তিনি একজন “ভদ্রলোকের” মতো পোশাক পরেন না। উত্তরে বিবেকানন্দ শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, “আপনাদের সংস্কৃতিতে দর্জি একজন ভদ্রলোক তৈরি করে; আমার সংস্কৃতিতে চরিত্রই মানুষকে ভদ্রলোক বানায়।” এই কথায় তিনি নৈতিকতা, আত্মসম্মান ও চরিত্রের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে মানুষের মূল্যায়ন তার চিন্তা, আচরণ ও মানবিক গুণাবলীর ভিত্তিতে হওয়া উচিত।

জয়পুরে একবার স্বামী বিবেকানন্দ একজন বিখ্যাত বাঈজির অনুষ্ঠানে যেতে প্রথমে অস্বীকার করেন, কারণ তিনি একজন সন্ন্যাসী ছিলেন। কিন্তু বাঈজিটি সুরদাসের একটি ভজন গেয়ে শোনান, যার মর্মার্থ ঈশ্বরের নাম মন্দিরের লোহার দরজায় যেমন, তেমনি কসাইয়ের ছুরিতেও সমানভাবে বিরাজমান। এই ভাবনায় গভীরভাবে প্রভাবিত হয়ে বিবেকানন্দ উপলব্ধি করেন যে ঈশ্বর সব জায়গায়, সব মানুষের মধ্যেই আছেন। এরপর তিনি আর কাউকে তুচ্ছ বা নিন্দা করতে পারেন না বলে অনুভব করেন। 

১৮৯৭ সালে মধ্য ভারতের দুর্ভিক্ষের সময় এক গো-রক্ষা সমিতির প্রচারক স্বামী বিবেকানন্দের কাছে অনুদান চাইতে এলে তিনি অস্বীকার করেন। এতে প্রচারক যখন শাস্ত্রের দোহাই দিয়ে বলেন যে গরু “আমাদের মা”, তখন বিবেকানন্দ তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গের সঙ্গে উত্তর দেন: “হ্যাঁ, গরু যে আমাদের মা, তা আমি বুঝি—এত গুণী সন্তান আর কে জন্ম দিতে পারত?” এরপর তিনি স্পষ্ট করে জানান যে একজন সন্ন্যাসী হিসেবে তাঁর পরম কর্তব্য হলো মানুষের সেবা—ক্ষুধার্তকে খাদ্য দেওয়া, শিক্ষা থেকে বঞ্চিতকে শিক্ষা দেওয়া এবং মানুষকে আধ্যাত্মিক শক্তিতে উদ্বুদ্ধ করা। মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ না হলে তিনি কোনো পশুকল্যাণে অনুদান দেবেন না। পরে তিনি শিষ্যদের বলেন, যে দেশ নিজের অনাহারী মানুষকে উপেক্ষা করে পশুকে অগ্রাধিকার দেয়, তা দেশটির চূড়ান্ত অধঃপতনের প্রমাণ।